সাঈদকে ছাড়াতে গভীর রাতে থানায় তদবিরের অভিযোগ; অর্থ লেনদেনের গুঞ্জন, আটকের বিষয়ে ওসির ‘জানা নেই’ বক্তব্যে প্রশ্ন
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ক্যাসিনো ও অনলাইন জুয়া চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আবু সাঈদ মিয়া (২৮) নামে এক যুবককে আটকের প্রায় চার ঘণ্টা পর মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তাকে ছাড়াতে গভীর রাতে থানায় তদবির চলে এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি ‘রফাদফা’ করা হয়।
তবে সাঈদকে আটক ও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বুধবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গামোড়-চাঁন্দের বাজারসংলগ্ন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে পুলিশ সাঈদকে আটক করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, মাঠে তাকে ঘিরে জিজ্ঞাসাবাদের পর থানায় নেওয়া হয়। রাতেই কয়েকজন ব্যক্তি থানায় গিয়ে তাকে ছাড়াতে তদবির করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। থানার গোলঘর ও পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় আলোচনা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঈদের পক্ষে থানায় যাওয়া এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, এক এসআই তাকে ছাড়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পরে টাকা দেওয়ার পর সাঈদকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আবু সাঈদ মিয়া দামোদরপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গামোড় গ্রামের মকবুল হোসেন ব্যাপারীর ছেলে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তিনি ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সক্রিয় কর্মী এবং দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়া চক্রের ডিলার-এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তবে ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. মানিক খন্দকার জানান, কোনো ওয়ার্ডে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটি ঘোষণা হয়নি; সাঈদ ১ নম্বর ওয়ার্ডের একজন কর্মী এবং দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।
মুচলেকা নিয়ে সাঈদকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দামোদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) আব্দুর রশিদ শেখ, যিনি সাঈদের চাচা। সন্ধ্যার দিকে মুঠফোনে তিনি বলেন, সাঈদ আগে জুয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে পারিবারিক চাপ ও সমস্যার কারণে ওই কর্মকাণ্ডে নেই। বর্তমানে বাজারে ব্যবসা করেন বলেও দাবি করেন তিনি। রাতে তিনি ও মোরশেদুল ইসলাম থানায় গেলেও সাঈদকে সেখানে পাননি। পরে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
তদবিরের অভিযোগ ওঠা মোরশেদুল ইসলামও দাবি করেন, তিন-চার বছর আগে সাঈদ জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে নেই। রাত ১টার দিকে তিনি রংপুর থেকে বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে ইউপি সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে থানায় যান। সেখানে সাঈদের বাবা ও ভাই ছিলেন। উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছামছুল হকের সঙ্গে তাদের কথা বলতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন মোরশেদুল।
সাঈদকে আটকের পর থানায় থাকা আঙ্গুর মিয়াও জানান, সাঈদ আগে জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে জড়িত নন বলে তিনি জানেন। তাকে ছাড়াতে পুলিশের টাকা দাবির বিষয়টি তার জানা নেই। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তাকে হয়রানি করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
এদিকে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে সাদুল্লাপুর থানার ওসি এ কে এম হাবিবুল ইসলাম হাবিব মুঠোফোনে জানান, সাঈদকে আটকের বিষয়টি তিনি জানেন না; অসুস্থ থাকায় পরে খোঁজ নিয়ে জানাবেন। পরদিন বুধবার বিকেলে থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই আবু তালেব বলেন, তিনি ওই রাতে রসুলপুর এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে অভিযানে ছিলেন এবং সাঈদকে আটক বা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কিছু জানেন না।
বুধবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। এক পর্যায়ে কলব্যাকের বার্তা পাঠালেও পরে আর সাড়া দেননি। বিষয়টি অবগত করতে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) বিদ্রোহ কুমার কুন্ডুর সঙ্গেও সরকারি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়; তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানার এক পুলিশ সদস্য জানান, সাঈদকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তদবির বা অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার ভাষ্য, ‘সবকিছু ওসি স্যার দেখেন।’
সাঈদকে কেন আটক করা হয়েছিল এবং কী প্রক্রিয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো—এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাদুল্লাপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কমরেড কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অভিযোগের ভিত্তি ও মুক্তির আইনগত প্রক্রিয়া স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধী যেই হোক আইনানুগ ব্যবস্থা এবং কাউকে হয়রানি বা আটকের সুযোগে তদবির-ঘুষের অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত হওয়া দরকার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এলাকার বাসিন্দাদের অনেকের অভিযোগ, সাঈদ আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০২৪ সালের সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে দলটির প্রার্থীদের পক্ষে কাজ ও অর্থ ব্যয় করেন। ৫ আগস্টের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতৃত্ব পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৭–৮ বছরে ক্যাসিনো-জুয়া চক্রে জড়িয়ে সাঈদ বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার একাধিক আবাদি ও বাজারের জমি, দোকান এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বন্ধক নেওয়া জমি রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও তার বাবা মকবুল হোসেন প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালালেও বর্তমানে ছেলের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, চাঁন্দের বাজারে সাঈদের মুদি, তেল, সার ও কীটনাশকের ব্যবসা রয়েছে। গত কয়েক বছরে তার সম্পদ ও পরিবারের আর্থিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ক্যাসিনো-জুয়ার মাধ্যমে এসব জমি, দোকান ও অন্যান্য সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় কয়েকজন আরও দাবি করেন, সাঈদের বাড়িতে কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস রয়েছে এবং সেখান থেকে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব ডিভাইস তদন্তের আওতায় এনে পরীক্ষা করলে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে তাদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
এদিকে সাঈদের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাবা মকবুল হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকাশ্যে আটকের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কেন কোনো মামলা ছাড়াই তাকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হলো? আটকের কারণ, জিজ্ঞাসাবাদের ফল, মুক্তির আইনগত ভিত্তি এবং তদবির-অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..