বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:
কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (আনুমানিক ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা) খরচে একটি সর্বাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ নির্মাণ-মেরামতকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই বৃহৎ সামুদ্রিক অবকাঠামো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে, যার ফলে বাংলাদেশ সরকারের ওপর কোনো ঋণের বোঝা চাপবে না।
বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত
অংশীদারত্ব
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড’ এই প্রকল্পে এককভাবে অর্থায়ন করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কারিগরি অংশীদার হিসেবে কাজ করবে চীনের বিখ্যাত ‘চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিই) কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের কাজ চলছে।
মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতেই
প্রস্তাবিত পিপিই কাঠামো অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ২০০ একর জমি ও বিদ্যমান স্থায়ী সম্পদের পূর্ণ মালিকানা নিজেদের দখলে রাখবে। চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নির্মিত আধুনিক অবকাঠামোর সব মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হবে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অক্ষুণ্ন রেখেই বিদেশি মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ব্যবহারের বড় সুযোগ তৈরি হলো।
বিশ্বমানের সুবিশাল শুষ্ক ডক ও অবকাঠামো
প্রকল্পটি ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে বড় পরিসরে তৈরি করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এখানে দুটি বিশাল শুষ্ক ডক (ড্রাই ডক) নির্মাণ করা হবে:
প্রথম শুষ্ক ডক: দৈর্ঘ্য ৬০০ মিটার এবং প্রস্থ ৯৫ মিটার (আন্তর্জাতিক বড় বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উপযোগী)।
দ্বিতীয় শুষ্ক ডক: দৈর্ঘ্য ৪৬০ মিটার এবং প্রস্থ ৮৫ মিটার।
ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ: আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে তৃতীয় একটি শুষ্ক ডক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান রাখা হয়েছে।
শুষ্ক ডকের পাশাপাশি এই কেন্দ্রে থাকবে জাহাজ মেরামত ও জাহাজ নির্মাণের আলাদা ঘাট, বিভিন্ন কাঠামো ও যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা, পাইপ ও মেকানিক্যাল শপ, ইলেকট্রিক্যাল ও অটোমেশন কারখানা, গুদামজাতকরণের সুবিধা এবং ভারী যন্ত্রপাতি উত্তোলনের বিশেষ ব্যবস্থা। একই সাথে পরিবেশ সুরক্ষায় এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘গ্রিন জোন’ বা সবুজ প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হবে।
নেপথ্যে বাংলাদেশি প্রকৌশলীর আন্তর্জাতিক কৃতিত্ব
বিশাল এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি সামুদ্রিক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামের। তিনি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণকারী এই পেশাজীবী দেশের যশোর জিলা স্কুল, পালং তুলাসার উচ্চবিদ্যালয়, নটর ডেম কলেজ এবং চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে পড়াশোনা শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম শ্রেণির সনদপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এবং অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন ক্রস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তাঁর আন্তর্জাতিক পেশাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে দেশের মাটিতে এত বড় বিনিয়োগ আসা জাতীয় পর্যায়েও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ সামুদ্রিক প্রকৌশল ও সবুজ জাহাজ নির্মাণশিল্পে বিশ্বের বুকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..